বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শরিফ ওসমান হাদির মতো তরুণ নেতার হত্যাকাণ্ডে দেশ এখন উত্তাল। আমাদের মাঝে তার এই না থাকা পুরো জাতিকে গভীর বেদনায় জর্জরিত করেছে। তবুও এটি শুধু এক ব্যক্তির অকাল প্রয়াণ কিংবা সাধারণ ‘পলিটিক্যাল কিলিং’ নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতম বিষয়গুলোকে আবারও সামনে তুলে ধরে। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সামাজিক ন্যায্যতা এবং নেতৃত্বের পরিমণ্ডল নিয়ে একটি তীব্র সংশ্লেষও বটে। জীবিত থাকতে রাজপথের এই সৈনিক বহুবার নিজের হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা করেছিলেন। তবুও প্রস্তুত ছিলেন দেশের জন্য, দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য নিজের বলিদান দিতে। তার এই আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন আমাদের দায়িত্ব। তবে সেই নিশ্চয়তা হিংসা, হানাহানি, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ভাঙচুর এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আসবে না; আসবে না নিছক প্রতিশোধের মাধ্যমে। হাদির আত্মত্যাগকে সফল করতে হবে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করে, যেই পরিবেশে আর কোনো হাদির ওপর হামলা হবে না।
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশি রাজনীতির একটি নতুন প্রজন্মের মুখপাত্র। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ২০২৪ সালে জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ছিলেন। হাদিদের সেই বিক্ষোভই শেষ পর্যন্ত তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালের অবসান ও রাজনৈতিক উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে হাসিনার পতনের পর হাদি কিন্তু নতুন স্বৈরাচার হয়ে ওঠেননি। সুযোগ থাকলেও ক্ষমতার জাহির করেননি। বরং হাদি ছিলেন গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক ন্যায্যতার কণ্ঠস্বর। তিনি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়ে প্রচার শুরু করেছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল, জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে আওয়াজ তোলার।
সেই কণ্ঠস্বর দমাতেই গত ১২ ডিসেম্বর, পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে জুমার নামাজ থেকে বের হওয়ার পর দুইজন মোটরসাইকেল আরোহীর আক্রমণে হাদি গুলিবিদ্ধ হন। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তিনি প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে বাঁচিয়ে তোলার শেষ উপায় অবলম্বনে সিঙ্গাপুরেও নেওয়া হয়। সেখানে ডাক্তারদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান। হাদি বলেছিলেন বিপ্লবীরা শহিদ হন রাজপথে। ঠিক সেভাবেই গৌরবোজ্জ্বল শাহাদাৎ বরণ করেছেন হাদি।
ওসমান হাদির বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মধারা বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার খেলা নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন। তার ভাষায় বারবার ফিরে এসেছে সৎ রাজনীতি, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, জনগণের অধিকার ও ন্যায়ের প্রশ্নই মুখ্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্রের কাঠামোও টেকসই হয় না। তাই আপসকামী সুবিধাবাদের বদলে তিনি তরুণদের আহ্বান জানিয়েছিলেন সত্য বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং রাজনীতিকে কলুষমুক্ত রাখার।
রাজপথে ওসমান হাদি ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। কিন্তু সেই প্রতিবাদ ছিল দায়িত্বশীল ও যুক্তিনির্ভর। তার বক্তব্যে সহিংসতার উসকানি নয়, ছিল ন্যায়বিচারের দাবি; প্রতিহিংসা নয়, ছিল সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা। তিনি মনে করতেন, রাজপথ জনগণের, এখানেই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি বিকশিত হয়। তাই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, নাগরিক সংহতি ও আইনের শাসনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হাদির রাজনীতি ছিল ভবিষ্যৎমুখী। তিনি তরুণ সমাজকে বলতেন রাজনীতি মানে শুধু স্লোগান নয়; এটি চরিত্র, অধ্যবসায় ও স্বচ্ছতার পরীক্ষা। আজ তার অকাল প্রস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সৎ রাজনীতি কেবল বক্তব্যে নয়, চর্চায় টিকিয়ে রাখতে হয়। রাজপথে ন্যায়ভিত্তিক প্রতিবাদ আর নৈতিক রাজনীতির যে বার্তা তিনি রেখে গেছেন, সেটিই হতে পারে বর্তমান সংকটময় সময়ে আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দিশা।
অথচ হাদির মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সারা দেশে প্রতিবাদ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নেমে আসে। তবে একপর্যায়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দৈনিক প্রথম আলো এবং দি ডেইলি স্টারের প্রধান কার্যালয়গুলোয় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। কর্মীদের ভবনের ভেতরে রেখেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে। এই সহিংস কর্মকাণ্ডের কথা হাদি বলতেন না। হাদি বেঁচে থাকলে তিনি নিজেও আজ এই অপরাধের নিন্দা জানাতেন। এগুলো করে হাদির শাহাদাতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে না।
আবার আমাদের বুঝতে হবে যে, হাদির মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হারানোর বিষয় নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক স্তরে নতুন একটি সংকটের আভাস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাগত সমস্যার বীভৎস চিত্র আবারও ফুটে উঠল ন্যক্কারজনক এই ঘটনার মাধ্যমে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র এবং কখনো কখনো সহিংসতা এবং অপপ্রচার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায়শই রাজনৈতিক দলের ভেতরে ও বাইরে থাকা বিরোধিতা দলীয়, ব্যক্তিগত, মতাদর্শগত সংঘাতের রূপ নেয়। হাদির মতো একজন শান্তিপূর্ণ কর্মীও সহিংসতার শিকার হতে পারে, এটা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক পরিবেশ কতটা ভয়ংকর ও সংক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে চলছে। এই সহিংসতা মানুষকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং ভোটারদের আস্থা কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়।
অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক কোনো দেশে রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা ও সমান অংশগ্রহণ আইনশৃঙ্খলার অন্যতম ভিত্তি। হাদির ওপর গুলি চালানো এবং তাতে সমান প্রতিরোধী প্রতিকার না পাওয়া; এই সবই আমাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক উত্তেজনায় প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক বুকেও চাপ তৈরি হয়েছে। যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঢাকাস্থ দূতাবাসগুলো শোক, উদ্বেগ এবং নিন্দা প্রকাশ করে বিবৃতি দিচ্ছে। রাজনৈতিক সংকট এখন ঘরোয়া ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করছে।
তবে শুধু শোক ও ক্ষোভ প্রচার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে পুনর্গঠনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। যেমন সংকট নিরসনে এবং পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আগেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। অনেক কিছু ছাড় দিয়ে হলেও রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে হবে। সহিংসতার পথ নয়, বরং বিতর্ক ও মতভেদ ভাষণ এবং যুক্তির মাধ্যমে জটিলতা নিরসন করতে হবে। এতে সমাজে স্বচ্ছতা ও সহাবস্থান গড়ে উঠবে। নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্সংগঠন করতে হবে।
রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের জন্য শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও বলয়ের সঠিক ব্যবহার অপরিহার্য। রাজনৈতিক সহিংসতা দমন করা না গেলে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। সেই সঙ্গে বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত নিরীক্ষণ এবং আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারব্যবস্থা সুষ্ঠু না হলে জনগণের আস্থা ক্ষুণœ হবে, এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে। যুবসমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে হবে এবং সহিংসতার বদলে নৈতিক রাজনৈতিক শিক্ষা সহায়তা দিতে হবে। তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আধুনিক রাজনীতির শক্তিশালী ভিত্তি; তাই শিক্ষা ও আদর্শগত সমর্থন জরুরি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে হবে। তবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও বিবেচনার প্রতি আরও সতর্ক হতে হবে, যাতে উত্তেজনা ছড়ানো নয়, তথ্যের সত্য-নির্ভুল পরিবেশন নিশ্চিত হয়। গণমাধ্যমকে কোনো পক্ষপাতিত্বে না নিয়ে তথ্য-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
শরিফ ওসমান হাদির অকাল মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পুস্তকের এক কলঙ্কিত এবং দুঃখজনক কালো অধ্যায়। এটি একটি ব্যক্তিগত শোকবোধের ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের প্রতীক। একজন তরুণ তুর্কীর জীবনলয় থেকে তুলে নেওয়া সমগ্র জাতিকে সেই সংকট মোকাবিলায় দায়িত্ব নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যদি আমরা এই ঘটনাকে সহিংসতার উৎস হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনর্গঠনের এক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু এর জন্য দরকার সমন্বিত রাজনৈতিক অস্ত্র, সংলাপ, আইনের শাসন ও জনমতের মর্যাদা। তবেই আমরা এই পরিস্থিতি থেকে নিজেদের উত্তরণ করতে পারব। শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আমরা শোক করি; শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, তার স্মৃতিকে আমরা মর্যাদাপূর্ণ গণতান্ত্রিক জীবন অর্জনের যুদ্ধে রূপান্তরিত করতে পারি।
প্রকাশকঃ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ
তারিখঃ ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

