যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নেতিবাচক বিশ্ব, সুযোগ রাশিয়ার

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে বিশ্বের অন্য দেশগুলো। শুধু তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশ নয় বরং ট্রাম্প এবং তার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সমালোচনা করছেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও। এমন প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুতের সুযোগ রয়েছে রাশিয়ার সামনে। বিশ্বের জন্য নিজের দুয়ার উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে ভূ-রাজনীতিতে নিজের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার দীর্ঘদিনের চেষ্টায় সফল হতে পারে রাশিয়া।

১৯৩১ সালে মার্কিন ইতিহাসবিদ জেমস ট্রুসলো অ্যাডাম তার ‘দ্য এপিক অফ আমেরিকা’ বইতে ‘আমেরিকান ড্রিম’ শব্দটি ব্যবহার করলে বিশ্বজুড়ে বিষয়টি খ্যাতি লাভ করে। এখান থেকেই শব্দটি যুক্তরাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক রাজনীতি ও সমাজনীতির আলোচনায় স্থান লাভ করে। যদিও এর অনেক আগে থেকেই বিশ্বের লাখো মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। আমেরিকায় প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে, স্বপ্ন পূরণ হবে একটি সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন জীবনের; মোটা দাগে এটাই হলো ‘আমেরিকান ড্রিম’। এই স্বপ্ন পূরণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে যাদের সিংহভাগই সফল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্টেট যেমনÑ নিউইয়র্ক, মিশিগান, শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়াকে বলা হয়ে থাকে ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসীদের হাতে গড়া। কিন্তু সেই আমেরিকান ড্রিমে এখন ভাটা পড়েছে। ২০১৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে যে কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, সেটি দ্বিতীয় মেয়াদে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করছেন তিনি। ফলে অভিবাসীদের জন্য এখন এক মূর্তিমান আতঙ্ক যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসন।

এমন প্রেক্ষাপটে ‘রাশিয়ান ড্রিম’ নিয়ে হাজির হতে পারে পুতিনের দেশ। রাশিয়া যে এ কাজটি করছে না সেটা না, বরং দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের কাছে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে দেশটি। বিশেষ করে বিশ্বের শতাধিক দেশের তরুণ, মেধাবী ও সম্ভাবনাময় তরুণদের মাঝে নিজের একটি অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে রাশিয়া। এ জন্য যুব সম্পর্কিত দেশটির কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘রোসমোলোদেজ’ এর উদ্যোগে এবং ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টরেট’ এর আয়োজনে প্রতি বছর বেশকিছু যুব প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে এর পরিধি আরও বাড়ানোর এখনই উপযুক্ত সময় রাশিয়ার জন্য।

‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল অ্যাসেম্বলি-২০২৫’ এ অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দেখেছি যে, এ ধরনের আয়োজনে রাশিয়া কতটা আন্তরিক এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কতটা অতিথিপরায়ণ। এসব আয়োজনে বেশ অর্থও বিনিয়োগ করে মস্কো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রাশিয়ার এই উদ্যোগ বিশ্বের অনেক দেশেই অতটা পরিচিত নয় এবং অনেক দেশের জন্যই ভিসা প্রক্রিয়া বেশ জটিল। এমন আয়োজনের আমন্ত্রণপত্র এবং আয়োজকদের আন্তরিকতায় ভিসা পাওয়া এক প্রকার নিশ্চিত হলেও, অংশগ্রহণকারীর দেশে অবস্থিত রুশ দূতাবাস কর্তৃক সৃষ্ট কিছু জটিলতায় ভিসা প্রক্রিয়া এখনো বেশ জটিল। ভিসা পেলেও কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয় রাশিয়ান ইমিগ্রেশনেও। এ বিষয়গুলো সহজ করে নিজেদের কার্যক্রম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও তুলে ধরতে পারলে তরুণদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সমান্তরাল একটি অবস্থানে খুব সহজেই আসতে পারে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তরুণ এবং পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে ‘ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ’, ‘হুবার্ট এইচ. হামফ্রি ফেলোশিপ’, ‘ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড স্টাডি প্রোগ্রাম’, ‘ফিউচার লিডারস এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ভিসিটর লিডারশিপ প্রোগ্রাম (আইভিএলপি)’ আয়োজন করে, রাশিয়াও এমন কর্মসূচি বর্ধিত পরিসরে চালু করতে পারে। কারণ ইউএস এইডের মাধ্যমে দেওয়া অর্থ সহায়তা কমানোর পাশাপাশি এ ধরনের কর্মসূচি সংকুচিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর ঠিক এটাই সুযোগ রাশিয়ার জন্য। আবার যুক্তরাষ্ট্র যেমন পেশাভিত্তিক (সাংবাদিকদের জন্য এডওয়ার্ড আর. মুরো প্রোগ্রাম) এবং অঞ্চলভিত্তিক (আফ্রিকা অঞ্চলের জন্য ইয়ং আফ্রিকার লিডারস ইনিশিয়েটিভ এবং ম্যান্ডেলা ওয়াশিংটন ফেলোশিপ) কর্মসূচি রেখেছে, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া; আর সৃজনশীলন পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে মস্কো। এর মাধ্যমে বিশ্বের তরুণদের স্বপ্ন পূরণের সাথী হতে পারে দেশটি।

রাশিয়ার জন্য আরেকটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার তো বটেই, সেখানকার জনগণের সঙ্গে সরাসরি ও দৃঢ সম্পর্ক স্থাপন এবং সেটি জোরদারের। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে ইচ্ছুক পর্যটক এবং অভিবাসীদের জন্য দুইটি বড় দুঃসংবাদ দিয়েছেন। এক, যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভিসা জামানত আরোপ এবং দুই, সব ধরনের অভিবাসী আবেদন প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া। প্রথমটিতে বাংলাদেশসহ প্রায় ৩৫টি দেশ আছে এবং দ্বিতীয়টিতে ৭৫টি দেশ। অভিবাসী ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধের তালিকায় বাংলাদেশসহ খোদ রাশিয়াও রয়েছে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে পারে মস্কো। নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় দেখানো এবং ‘বিজনেস হাব’ এ পরিণত করতে পারলে, বৈশ্বিক পর্যটনের একটি বড় অংশের বাজার নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে রাশিয়া। অন্যদিকে, অভিবাসীদের জন্য একটি আস্থা ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে হাজির হতে পারে দেশটি, যা রাশিয়ার প্রয়োজনও বটে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের থেকে আয়ের পাশাপাশি নিজেদের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্বল্পমূল্যের শ্রম কিনতে অভিবাসীদের কাজে লাগাতে পারে রাশিয়া। এর বিনিময়ে শুধু দিতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা, যা এখন ওয়াশিংটন দিচ্ছে না। অভিবাসী ভিসা আবেদন বন্ধের ঘোষণায় বিশ্বের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলোতে এখন অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে অভিবাসী ভিসাপ্রত্যাশী থেকে শুরু করে সদ্য বিবাহিত ব্যক্তিদের স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে একত্রিত হওয়া (ফ্যামিলি রি-ইউনিয়ন) অনিশ্চিত। রাশিয়াকে কাজ করতে হবে ঠিক এই জায়গাতেই।

বিশয়টি রাশিয়ার জন্য আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময় হতে পারে। আর সেটি হচ্ছে ‘ব্রিকস’। অভিবাসন ভিসা বন্ধ হওয়া ৭৫টি দেশের তালিকার পাঁচটিই ‘ব্রিকস’ সদস্য। এতে ব্রিকসের উদ্যোক্তা রাশিয়াসহ রয়েছে ব্রাজিল, মিশর, ইথিওপিয়া এবং ইরান। এ ছাড়াও রাশিয়ার থেকে জ্বালানি তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপের একটি বিলে সম্প্রতি স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিলটি পাস হলে রাশিয়ার থেকে তেল কেনা যেকোনো দেশের ওপরই এই ট্যারিফ কার্যকর হবে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরি সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। ফলে চীনের ওপরও যেকোনো সময় ট্রাম্প খড়গ আসতে পারে। তাই উদ্যোগী হলে এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করতে পারে মস্কো, যেখানে দিল্লি এবং বেইজিং উভয়ের সঙ্গে তার আন্তরিক বন্ধুত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে চীনের বাজারের প্রতি কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির আগ্রহ উদাহরণস্বরূপ হতে পারে পুতিনের জন্য।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড জটিলতাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ড অধিকরণে বিশেষ আগ্রহী ট্রাম্পকে ঠেকাতে সংঘবদ্ধ হয়েছে ইউরোপের বেশকিছু দেশ, যারা আবার মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোরও সদস্য। ভেনেজুয়েলার মতো গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সামরিক অভিযান ঠেকাতে ডেনমার্কের পাশাপাশি সেখানে সেনা মোতায়েন করেছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড। এর প্রতিবাদে দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ট্যারিফ আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী জুনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করা না হলে, ট্যারিফের অঙ্ক আরও বাড়ানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, বন্ধুদের ওপর ট্যারিফ আরোপ করা কোনো সংকটের সমাধান নয়। তাই এমন প্রেক্ষাপটে ইউরোপের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে মস্কো। আর তেমনটা করার এখনই সব থেকে আদর্শ সময়।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, নিজেকে বৈশ্বিক রাজনীতির ‘সুপ্রিম’ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত আন্তর্জাতিক মিত্রদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। একতরফা ভিসা, শুল্ক ও সামরিক ভাষ্য বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ঠেলে দিচ্ছে এবং দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে উৎসাহিত করছে। এই শূন্যতায় নতুন ধারণা, নতুন জোট এবং সম্ভাব্য ‘রাশিয়ান ড্রিম’ জন্ম নিতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, টেকসই নেতৃত্ব আসে অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতি ও আস্থার মাধ্যমে; একক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়।

প্রকাশকঃ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ

তারিখঃ জানুয়ারি ২১, ২০২৬

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *