নানান বিতর্কের মধ্যেই স্বৈরাচারী স্টাইলে নতুন বছরের প্রথম দিনে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টি রেজিস্ট্রার’ বা এনইআইআর চালু করলো সরকার তথা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সৌভাগ্যবান বাংলাদেশ জাতি দেশের প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের কাণ্ডারি হিসেবে দীর্ঘদিন পেয়েছিল ‘স্টিফ জব্বার’কে। বর্তমানে স্টিভ জব্বারের দায়িত্ব সগৌরবে পালন করছেন ‘টিম ফাইজ’, যিনি বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের একমাত্র বোদ্ধা বা জেন-জি’র ভাষায় ‘সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট’। ইংরেজি বুঝতে সমস্যা হলে বাংলায় আপনারা একে ‘আত্মম্ভরী’ বলতে পারেন। আরও সহজে বুঝতে চাইলে ‘সবজান্তা ঘাড়ত্যাড়া’ও বলতে পারে। তো এই সবজান্তা ব্যক্তি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার মতই এই এনইআইআর চালু করেছেন।
হীরক রাজার অন্যতম এই সেনাপতি এনইআইআর চালু করলেও, এর কারিগরি অনেক দিক ঠিকমত ফাংশন না করায়; শুরুতেই নানান বাঁধা বিপত্তি দেখা দেয়। এক ব্যক্তির একটি জাতীয় পরিচয় পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে শত শত হ্যান্ডসেট নিবন্ধিত দেখা যায়। এ নিয়ে যখন দেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়, তখন তিনি হাজির হলেন বিশাল এক ‘ডাইভারশন’ নিয়ে। এই ডাইভারশন হচ্ছে, সাধারণ মানুষকে ‘বোকাচোদা’ ভেবে তাদের মনযোগ অন্যত্র সরানো।
সেই ডাইভারশন কী? সেই ডাইভারশন হলো – বাংলাদেশের টিম ফাইজ তার জ্ঞান সংরক্ষণাগার ‘ফেসবুক’ এ লিখলেন যে, দেশে নাকি একটি IMEI ৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ দিয়ে ৩.৯১ কোটি ডিভাইস রয়েছে। এখন এই সব IMEI নম্বর কি মুঠোফোন বা মোবাইলের? উত্তর হচ্ছে – না। এই কথাটি চতুরতার সাথে টাকলা সেনাপতিও বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “স্মার্টফোনের পাশাপাশি এ ধরনের IMEI বিভিন্ন IOT ডিভাইসেরও হতে পারে। যদিও অপারেটর মোবাইল ডিভাইস, সিম সংযুক্ত ডিভাইস এবং IOT ডিভাইসের IMEI আলাদা করতে পারে না। যেমন হতে পারে, CCTV বা এ ধরনের ডিভাইস হয়ত একই IMEI নম্বরে আনা হয়েছে”।
তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়ালো? বিষয়টি দাঁড়ালো যে, প্রায় ৪ কোটি ডিভাইসের মধ্যে মোবাইল ফোন (ফিচার ও স্মার্ট) থাকতে পারে। থাকতে পারে ট্যাবলয়েড পিসি বা ট্যাব, ল্যাপটপ, স্মার্টওয়াচের মতো ডিজিটাল এক্সেসরিজ, ট্র্যাকার এবং আইওটি ডিভাইস। আইওটি ডিভাইসের সংজ্ঞায় না গিয়ে উদাহরণ দেই, সহজে বুঝবেন। আইওটি ডিভাইস হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা, গাড়ির ভেতরে থাকা অ্যান্ড্রয়েড ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, ভেহিক্যাল ট্র্যাকের মতো এমন সব ডিভাইস যা সিম বা ওয়াইফাই এর মাধ্যমে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হতে পারে। এসব ডিভাইসেরও IMEI নম্বর থাকে। অর্থ্যাত IMEI নম্বর শুধু মোবাইলফোনের একক বিষয় নয়।
কিন্তু ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ থেকে কিন্তু স্টিভ ফাইজ এসব ডিভাইসের কথা বলেননি। এতদিন তিনি শুধু মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের ‘চোর’, ‘অবৈধ’, ‘চোরাচালানকারী’ এসব বলে সাধারণ মানুষের মাঝে একটা ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন। কিন্তু NEIR চালুর পর যখন দেখা গেলো, IMEI নম্বরে শুধু মোবাইল ফোন না বরং অন্যান্য IOT ডিভাইসও রয়েছে, তখন নিজের ন্যারেটিভ খানিকটা বদলান, তবে নিজের ফয়দা মতো আবার টুইস্টও করেন। উনি বলছেন যে, একই IMEI নম্বরের এই ডিভাইসগুলো মোবাইল ছাড়াও আরও অনেক কিছু হতে পারে। এগুলো আসলে কোন ডিভাইস, সেগুলো শনাক্তের সক্ষমতা মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমএনও) যেমন গ্রামীণফোন, বাংলালিংকের নেই। কিন্তু তিনিই আবার বলছেন যে, এগুলো ‘ক্লোন’ ও ‘ডুপ্লিকেট’ মোবাইল।
এই ফতোয়া দিয়ে ২০ লাখ মানুষের রুজি রুটিতে লাথি মেরেছেন ‘স্টিফ ফাইজ’, বাংলাদেশের একমাত্র জ্ঞানী বিশেষায়িত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। কয়েক শত কোটি টাকার ধনী নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি, যার টাকা কোন ব্যাংকে FDR করতে হবে, সেটা নিয়ে কয়েক মাস পরপরই সভা করতে হয়; সেই বিটিআরসিকে সিন্ডিকেটের টাকায় NEIR চালু করতে হয়। ভাবা যায়! কত গরীব আমাদের বিটিআরসি। এই সিন্ডিকেটের টাকার জোরেই সাধারণ মোবাইল ব্যবসায়ীদেরকে ‘চোর’, ‘অবৈধ’ ট্যাগ দিতে হয় স্টিফ ফাইজকে, ঠিক যেভাবে ফ্যাসিবাদি আওয়ামী লীগ সবাইকে জামাত-শিবির ট্যাগ দিতো।
সিরিয়াস আলোচনা
এবার আসেন তথ্যভিত্তিক সিরিয়াস আলোচনায়। বিটিআরসির ওয়েবসাইট বলছে, গত অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১৮ কোটির কিছু বেশি সিম কার্ড ব্যবহারকারী রয়েছেন। ধরে নিলাম, সবাই ১টি স্মার্টফোনে ১টি সিম ব্যবহার করেন। আমি স্মার্টফোনের সর্বোচ্চ সংখ্যা বের করার চেষ্টা করছি কারণ মোবাইল ব্যবসায়ীরা ‘চোরাই’ আর ‘অবৈধ’ স্মার্টফোনই তো আমদানি করেন, তাই না? তারা তো ফিচার ফোন বা IOT ডিভাইস আমদানি করেন না। তো এই ১৮ কোটি সিমের বিপরীতে কমপক্ষে ১৮ কোটি স্মার্টফোন আছে। যদিও বাস্তবে স্মার্টফোনের সংখ্যা এর অর্ধেকের মতো, তারপরেও আমি হাইপোথিসিসের জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যার ডাটা সেট করলাম।
এখন এই ১৮ কোটি হ্যান্ডসেটের ৪ কোটিই একই IMEI নম্বরের? সিরিয়াসলি! 35227301738634 এই নম্বরে নাকি ১৭.৫ লাখ হ্যান্ডসেট আছে। 35275101952326 এই নম্বরে ১৫.২৫ লাখ। ভাবা যায়? এটা তখনই সম্ভব যখন মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী এবং বিক্রয়কারী একই উৎসের হবে; মানে রসুনের গোড়াটা যখন এক জায়গায়। অর্থ্যাত যিনি এই IMEI নম্বর মোবাইলে যুক্ত করছেন এবং যিনি সেই মোবাইলগুলো বিক্রি করছেন; তাদেরকে পরস্পর যুক্ত হতে হবে।
এখন দেখি এটা কার পক্ষে সম্ভব?
একজন সাধারণ মোবাইল ব্যবসায়ীর পক্ষে ৪ কোটি তো দূর, একই IMEI নম্বরের ১৭ লাখ স্মার্টফোন বিক্রি সম্ভব কিনা নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন। ধরেন, গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ারের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসার ইহ জগতকালে একই IMEI নম্বরের ১৮ লাখ স্মার্টফোন বিক্রি করছে আর কেউ নোটিশ করে নাই? একই IMEI নম্বরের এই ১৮ লাখ ডিভাইসে গ্রাহকেরা গুগল আইডি লগ ইন করে ব্যবহার করতেছেন, কেউ অ্যাপল আইডি লগ ইন করে ব্যবহার করতেছেন; আর ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকা গুগল আর অ্যাপল আঙ্গুল চুষতেছে! সিরিয়াসলি তাই মনে করেন তাদেরকে? আর এত এত ডিভাইসের IMEI ম্যানুপুলেট করতে যে ফ্যাসিলিটি দরকার, সেটা কি এই মোবাইল বিক্রেতাদের আছে? এরা তো মোবাইল আনেই সর্বোচ্চ কয়েক শ, তাও গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার, সুমাসটেক, রিও, কেআরআই এর মতো বড় কোম্পানিরা। ছোট ব্যবসায়ীরা আনে ১০-২০টা করে। আর যদি সাধারণ মোবাইল ব্যবসায়ীরা এমনটা করেও থাকে, তো ধরেন না কেন? তারা তো দাবি করে আসছে যে, তাদেরকে কাছে এখনও অনেক স্মার্টফোন স্টক হয়ে আছে, অল্প সময়ে বিক্রি করতে পারবে না। তো যান তাদের দোকানে, গোডাউনে অভিযান করেন। দেখেন তাদের ডিভাইসে IMEI নম্বরের অবস্থা কী?
অন্যদিকে এত এত IMEI নম্বর স্মার্টফোনে জেনারেট করা সম্ভব শুধু স্মার্টফোন উৎপাদনকারী বা সংযোজনকারীদের পক্ষে। কারণ তাদের সেই ফেসিলিটি আছে। তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা তারাও এটা করেনি। এই ৪ কোটি, ১৭ লাখ, ১৫ লাখ – এগুলো সব গালগল্প। স্রেফ সাধারণ মানুষের মনযোগ অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য।
IMEI নম্বর বা NEIR এর মূল খেলা ডাটাবেইজে। এটা নিয়ে লিখবো পরের পর্বে ইনশাল্লাহ।

