আমাদের মাঝে অসততার একমাত্র চিত্র যেটা মাথায় গেঁথে আছে, সেটা হলো – কত টাকা মাইরা খাইলো? কেউ টাকা মেরে খাইলে, অসৎ; না মারলে – ওরে বাবা, সততার মূর্ত প্রতীক।
অথচ সততা বা অসততার আরও কিছু রূপ আছে। তবে সেদিকে আজ যাচ্ছি না। আজ আপাতত ডিজিটাল দুনিয়ার সততা ও অসততা নিয়ে থাকি।
ডিজিটাল দুনিয়ায় অসততা মানে শুধু টাকা খাওয়া না। ‘ডিজিটাল এসেট’ কী জিনিস, এটা যদি আপনি না বোঝেন বা বুঝতে না চান; তাহলে এই লেখার নিচে আর যাইয়েন না।
আপনাদের কারও মনে আছে কিনা জানি না, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার তার মালিকানাধীন (মালিকানা নিয়েও অভিযোগ আছে) ‘বিজয় কী-বোর্ড’ স্মার্টফোনে বাধ্যতামূলকভাবে ‘প্রি-ইন্সটল’ করে দেওয়ার আদেশ জারি করছিলেন। অবশ্য গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় (আমার লেখাসহ) সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এখানে উল্লেখ্য যে, স্মার্টফোনে আগে থেকেই ‘বিজয় কী-বোর্ড’ ইন্সটল থাকলে স্মার্টফোন ক্রেতার অতিরিক্ত কোন দৃশ্যমান খরচ নাই।
এখন বলেন, এখানে কী মোস্তাফা জব্বার কোন দুর্নীতি করছিল? স্মার্টফোনে আগে থেকে ‘বিজয়’ ইন্সটল থাকলে, সে বাবদ তো কোন টাকা কামায় (পড়ুন – মারা) নাই উনি, তাই না? উত্তরটা কমেন্টে দেবেন কিন্তু।
আপনার উত্তর যদি হয় যে, মোস্তাফা জব্বার কোন দুর্নীতি/অনিয়ম করেননি, তাহলে আপনি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবেরও কোন দুর্নীতি দেখবেন না। তবে উত্তর যদি হয় যে, জব্বার দুর্নীতি করছে, তাহলে আপনি ফয়েজের দুর্নীতি বুঝবেন। অবশ্য আপনি ফয়েজকে যদি সৎ বলেন, তাহলে আবার জব্বারকে অসৎ বলতে যাবেন না যেন। দু’মুখো আচরণ করবেন না প্লিজ।
এবার আসেন জব্বারকে দিয়ে বুঝি যে ফয়েজের দুর্নীতি কই। এটা বুঝতে হলে বুঝতে হবে যে, বিনামূল্যে কী-বোর্ড দিয়ে জব্বার কী কী উপায়ে কামাই করতে পারত।
১) আগে থেকেই ইন্সটল থাকার মাধ্যমে স্মার্টফোনে বাংলা কী-বোর্ড অ্যাপের বাজারে বিজয় আগে থেকেই সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতো। বলে রাখা ভালো, একই ধরনের অপরাধে আমেরিকা এবং ইউরোপে গুগল, ফেসবুকের মতো অনেক প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার জরিমানা করার রেকর্ড আছে।
২) অনেক ডিভাইসে ইন্সটল থাকার গ্রোথ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের থেকে টাকা উঠাইতে পারতো জব্বার।
৩) রয়্যালটির কারণে প্রতিটি কী-বোর্ড থেকে ১ টাকা পান জব্বার। তার মানে আপাতদৃষ্টিতে ‘ফ্রি’ হলেও স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোকে ১ টাকা করে দিতে হতো জব্বারকে। এই টাকা স্মার্টফোন কোম্পানির বাপে দিবে নাকি আপনি আমি দেবো? এবার ভাবেন, কত স্মার্টফোন বছরে বিক্রি হয় এই বঙ্গদেশে আর সেখান থেকে রয়্যালটি বাবদ কত পাইতেন জব্বার?
৪) এগুলা সব বাদ দিলেও, প্রচুর সংখ্যক ব্যবহারকারীর জন্য গুগল এডসেন্স থেকে অ্যাপে আসা বিজ্ঞাপন থেকে যে কামাইটা জব্বার কাকুর হইতো, সেটা নেহাত কম না।
জব্বার কাকুর এগুলা যদি খাতা কলমে দুর্নীতি নাও হয়, তাহলেও থেকে যায় ‘এথিক্স’ বা ‘ইন্টেগ্রিটি’ বা ‘ন্যায়পরায়ণতা’। আপনার আমার কাছে ন্যায়পরায়ণতা তেমন মূল্যবান না হলেও, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদধারীদের জন্য মারাত্মক জিনিস ভাই। কোন দুর্নীতি না করেও শুধু নৈতিক অধস্থলনের কারণে বহু বড় বড় ব্যক্তিকে গদি হারাতে হয়েছে। কেন? কারণ আপনি যদি নৈতিকভাবে ঠিক না থেকেও যত সৎ ব্যক্তিই হন না কেন, আপনার কাছে রাষ্ট্র, সরকার বা এগুলোর সম্পদ নিরাপদ না; আপনি বিশ্বাসযোগ্য না।
জব্বার কাকু সেই ইন্টেগ্রিটি এবং এথিক্স ভঙ্গ করেছেন। কীভাবে – তার পদ ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি জিনিস বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কোন উন্নত দেশে এই খবর প্রকাশের সাথে সাথেই জব্বারের গদি ‘নাই’ হয়ে যেতো। বাংলাদেশ বলে টিকে ছিল। এথিক্স’টা আমার মতো মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য মারাত্মক এক বিষয় রে ভাই। এই এথিক্স মানতে গিয়ে কতো নিউজ যে ‘কিল’ হইছে, তার হিসেব নেই। যাই হোক, আলোচনায় ফিরে আসি।
এখন ফয়েজ কী দুর্নীতি করছে আর কী এথিক্স ভাঙ্গছে? উপরের আলোচনা পড়ে ফয়েজের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলিয়ে নেন। তারপরেও উত্তর না পেলে আমার কিছু করার নাই। আমি কিন্ডারগার্ডেন স্কুল খুলে বসি নাই যে সবাইকে আলোকিত করতে থাকবো; বিশেষ করে যারা ‘তথ্য প্রতিবন্ধী’। তথ্যের সামান্য খোঁজ রাখলে, ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপের স্প্যাম বাদ দিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমে খানিকটা মনযোগ দিলে; ফয়েজের অতীত কুকীর্তি আপনার জানা থাকা উচিত।
এরপরেও সুযোগ আছে। ফয়েজের বিদেশ পালানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক তথ্য বেরিয়ে আসছে। যারা তার ভয়ে ছিলেন, তারা এখন তথ্য দিচ্ছেন, প্রমাণসহ। সেগুলো প্রকাশিত হবে; দ্রুতই ইনশাল্লাহ।

